আজ বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ ইং

মেঘ পাহাড়ের দেশে (পর্ব ৪)

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২০-১০-১৭ ০০:০৬:৫৬

ফারজানা ইসলাম লিনু :: এরমধ্যে কিচেনের ছেলেটা এসে বলে গেল নাস্তা রেডি। লুচি, ছোলা ভুনা, আলু ভাজিটা অনেক ভালো হয়েছে। ছেলেমেয়েদের নাস্তা আলাদা। আমাদের যা ভালো লাগে ছেলেমেয়েদের তা ভালো লাগেনা। ভালো লাগা না লাগার আলোচনা করতে করতে মনে পড়ে দেরী হয়ে যাচ্ছে। গেস্ট হাউসের গেটে আমাদের গাড়িও প্রস্তুত। ঝটপট রেডি হয়ে নাস্তা সেরে বের হতে হবে এক্ষুনি। পুত্রকন্যার বাপের আবার দেরী সহ্য হয় না।

পুজোর জন্য সুমো গাড়ি না পাওয়াতে দুটো ট্যাক্সি এসেছে আমাদের জন্য। একটা গাড়িতে সবাই মিলে ভ্রমণের মজাই আলাদা। কি আর করা, কিছুটা আনন্দ বঞ্চিত হয়ে দুইভাগে ভাগ হয়ে বেরিয়ে পড়ি আমরা। আমি, মা ও আমার ছেলে এক গাড়িতে। মেয়েদের গাড়িতে বাপকে উঠতে দেখে ছেলের সহ্য হয়না। ভেতরে ভেতরে খুব হিংসে হয় তার। নানা ছুতোয় যেতে চায় বোনদের গাড়িতে। মা আর দাদীর সাথে একজন অভিভাবক দরকার এই বলে জোর করে আমাদের গাড়িতে রাখি।

 বেচারার মনে শঙ্কা, মেয়েরা না জানি বাপকে নিয়ে বাড়তি কিছু একটা দেখে ফেলে। দুটো গাড়ি পরপর যাচ্ছে। অরণ্যে ঘেরা উপত্যকা শিলং পেরিয়ে ছুটে চলছি আমারা। রাস্তার দুপাশে ঘন অরণ্য। কালের সাক্ষী শতবর্ষী গাছগুলোর আকৃতি তাদের দীর্ঘায়ু জানান দেয়। আমাদের দেশে এত বিশাল সাইজের গাছ থাকলে কেটে ফেলার জন্য আমাদের হাত নিশপিশ করে। বন জঙ্গলকে সংরক্ষিত ঘোষণা করেও রক্ষা নেই। নানা ছুতোয় গাছ কাটা আমাদের চাই। অথচ নির্বিচারে শিলংয়ের বন ধ্বংস করলেও মজুদ শেষ হতে একশ বছরের বেশি সময় লাগবে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল শিলংয়ে ভুমি ক্রয় বিক্রয়ে স্বাধীনতার কয়েক বছর পর নতুন আইন পাশ হয়েছে। মেঘালয়ের আদিবাসী নিজস্ব নাগরিক ও সরকার ছাড়া বাইরের কেউ চাইলেই জমি কিনতে পারবে না। এতে করে উন্নয়ন কিছুটা বাধাগ্রস্থ হলেও প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা হচ্ছে।

যত্রতত্র আকাশছোঁয়া ভবন চোখে পড়েনা। নগরায়ন যা হচ্ছে তাতে করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য তেমন নষ্ট হচ্ছেনা। বনাঞ্চলের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের কারনে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা এখানে তেমন নেই। প্রকৃতির প্রতি মানুষের সহিংসতা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্টের অন্যতম কারণ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর এই শহরের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি পর্যটক ও পর্যটন ব্যবসা। পর্যটকদের একটা বড় অংশ আসে বাংলাদেশ থেকে। যা দেখতে আমরা মরিয়া হয়ে শিলংয়ে যাই তার অনেকখানি যে আমাদেরই আছে। বিছনাকান্দি, সারি নদী, পাংথুমাই ঝর্ণার সৌন্দর্য শিলংয়ের ঝর্ণার চেয়ে কম নয়। কিন্তু এইসব জায়গায় একবার গেলেই হয়েছে। রাস্তাঘাটের ভোগান্তিতে ইহ জীবনে যেতে ইচ্ছে করবেনা আর। তার উপর রয়েছে প্রকৃতির প্রতি মানুষের নৃশংসতা। গাছ কাটতে কাটতে উজাড়, পাথর তুলতে তুলতে গভীর খাদ করে তবেই না শান্তি। ভুমিখেকো, নদীখেকোদের তান্ডব শেষ হয় একেকটা জায়গার পরিসমাপ্তিতে।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আর আফসোস করতে করতে চলে এসেছি এলিফ্যান্ট ফলসের দ্বারগোড়ায়। কিন্তু অপেক্ষা করতে হবে, সাথের গাড়িটা যে পেছনে পড়ে গিয়েছে। পুত্রের টেনশন বেড়ে যায় বোনেরা মনে হয় বাপ কে নিয়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে।

গাড়ি থেকে নেমে অপেক্ষা করছি। আমাদের সঙ্গ দিচ্ছেন ট্যক্সির ড্রাইভার। বেটেখাটো মাঝবয়সী গনেশ বাবু কলকাতার লোক। অনেক সজ্জন আর সুশিক্ষিত ভদ্রলোক। সরকারি চাকুরীর সুবাদেই আঠাশ বছর থেকে শিলংয়ে বসবাস। সরকারি চাকুরী ভালো লাগেনি তাই চাকুরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পেনশনে চলে আসেন। বিনামেঘে বজ্রপাতের মত বিপদ নেমে আসে জীবনে। ষোল বছরের একমাত্র ছেলেটি নিউমুনিয়ায় মারা যায়। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে শিলংয়ের পাঠ চুকিয়ে বৃদ্ধা মায়ের সাথে থাকতে চলে যান কলকাতায়। ছায়া সুনিবীড় শান্তির নীড় ফেলে মন টিকেনা সেখানে। ছেলের কথা মনে হয় বেশি বেশি। তাছাড়া কলকাতার চারদিকে দুষন, কোলাহল, নিরাপত্তাহীনতা। সবকিছু মিলিয়ে শিলংয়ের জন্য মন কাঁদে। আপনজনদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে আবার ফিরে আসেন প্রকৃতির কোলে। নতুন করে জীবন শুরু করার পালা এবার। ছেলের কথা বলতে গিয়ে মনটা ভারাক্রান্ত হয় গনেশ বাবুর।সান্ত্বনা আমি দিতে পারিনা। যারা জীবন থেকে হারিয়ে যায় তারা তো আর ফিরে আসেনা। পিতা হয়ে একমাত্র কিশোর পুত্রকে নিজ হাতে মুখাগ্নি করতে কেমন লেগেছে তা গনেশ বাবুর মুখ দেখেই বোঝা যায়।

 তবুও নিয়তিকে কঠিন ভাবে মেনে নিয়ে শুরু করেন নতুন পথ চলা। অনাথ এক কন্যা সন্তান কে পালক নিয়েছেন। দুই বছর বয়সী মেয়েটাকে নিয়ে মোটামুটি দিন কাটছে গনেশ বাবু দম্পতির। বাচ্চাটার কাশি, একটু পরপর ফোন করে খবর নিচ্ছেন। স্ত্রীকে কড়া করে বলে দিলেন মেয়েকে একা রেখে রান্নাবান্না করতে হবে না, ঘরে যা আছে তা যেন খেয়ে নেন। পালিত মেয়ের জন্য ভদ্রলোকের স্নেহ ও দায়িত্ববোধ দেখে মা ও আমি যারপরনাই মুগ্ধ।

জোরে ব্রেক কষে পিতা কন্যাদের ট্যাক্সি এসে থামে আমাদের সামনে। মেয়েরা হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে নামে। ছেলের তড়িৎ প্রশ্ন, কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?
কোথাও না এইখানেই তো সরাসরি আসলাম।
দেরী হল যে?
গাড়িতে পেট্রোল নিতে একটু দেরী হয়েছে।
দেরীর কারণ শুনেও পুত্রের অবিশ্বাস কাটেনা।
আমদেরকে রেখে কোথাও যাওয়া হবেনা। যেখানেই যাই সবাই একসাথে যাব। আশ্বস্ত করি পুত্রকে।

গনেশ বাবুর সহায়তায় টিকেট সংগ্রহ করে ঝর্ণা দর্শনে রওয়ানা দেই আমরা। ঝর্ণার প্রবেশপথে ছোট ছোট খাবার দোকানে চলছে সুস্বাদু রান্নাবান্না। বড় এক কড়াইতে চলছে চাওমিন রান্না। পাশের চুলায় আরেক কড়াইতে ফ্রেস পাহাড়ি সবজি রান্না হচ্ছে। খাবারের আইটেম গুলো দেখে নিচ্ছি। পুত্র কন্যার বাবা জিজ্ঞেস করলেন কি খাব?

ফুলানো লুছি দিয়ে সবজি খাবো। তবে এখন না ফিরতি পথে খাব।তাছাড়া নাস্তাতো মাত্র করে এসেছি।

আদিবাসী দোকানীরা নানা পসরা সাজিয়ে বসেছে। বেশিরভাগই নিজেদের হাতে তৈরী জিনিস। বিশেষ করে খাসিয়াদের তাতে বা হাতে বোনা চাদর গুলো অনেক সুন্দর। রঙ সুতা ও নকশায় রয়েছে বৈচিত্র্য। দামও নাগালের ভেতরে আছে। সবগুলো দোকানে এক আধটু ঢু মারলাম। স্যুভেনির হিসেবে দু একখান জিনিস কিনে বেরিয়ে পড়ি।

ঝর্ণা দেখার বড্ড তাড়া সবার। ফলসের কাছাকাছি যেতে হবে আগেভাগে। ঝর্ণা অভিমুখে দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে। ঝর্ণার পতনের ছন্দময় কলধ্বনি দূর থেকে শোনা যাচ্ছে। কয়েক কদম হেটেই ঝর্ণার সবচেয়ে উচু ও প্রথম ধাপে চলে আসি। দিনে দুপুরে কেমন ধুসর অন্ধকার। অন্তহীন নিঃসঙ্গতার সাথে ঝর্ণার অবিরাম জলকল্লোলে মুগ্ধতা ছড়ানো। পর্যটকদের নিরাপত্তায় নির্মিত লোহার সীমানা প্রাচীর ঘেষে অপলক তাকিয়ে থাকি আমি। স্রষ্টার কি অপার মহিমা এত সুন্দর করে তৈরী করেছেন সবকিছু। সুউচ্চ পাহাড় থেকে তীব্র গতিতে ঝাপিয়ে পড়ছে উদ্দাম ঝর্ণা। ঘন জঙ্গল ভেদ করে সুর্যটাও ঠিকমত মুখ দেখাতে পারছে না। আলো ছায়ার লুকোচুরিতে তৈরী হয়েছে এক অপরূপ দৃশ্যপট। সাদা ফিতা সমেত ঝর্ণার একেবারে কাছে যাওয়া যায় না। পর্যটকদের সুবিধার্থে ঝর্ণা দর্শনের রয়েছে তিনটি স্তর। বিশাল বিশাল প্রস্তরখন্ডের উপর বসে নানা ভঙ্গিমায় চলে আমাদের ফটোসেশন। দ্বিতীয় স্তরে নামতে গিয়ে মনে হল মাকে নিয়ে সর্বনিম্ন স্তরে নামাটা ঠিক হবে না। যদিও পায়ে হাঁটা পথটুকু এতটা বিপদসঙ্কুল নয়। তুলনামূলক নিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও উঠার সময় বয়স্ক মানুষদের একটু সমস্যা হতে পারে। অনেক ভ্রমণ পিপাষু বয়স্ক পুরুষ মহিলা অবলীলায় উঠা নামা করছেন। কয়েকজন আবার মাঝ পথ থেকেই ফিরে আসছেন। মাকে নিয়ে নিচে যাওয়া উচিত হবে কিনা ভাবছি। অমনি মা নিজে থেকেই আর নিচে যেতে চাইলেন না। তাই মা কে নিয়ে ফিরে আসি আগের জায়গায়। এলিফ্যান্ট ফলসের নামকরণ ও আবিষ্কারের ইতিহাস সম্বলিত একটা ফলক চোখে পড়ে। খাসিয়ারা এই ঝর্ণার নামকরণ করে থ্রি স্টেপস ফলস। কিন্তু এই ফলস দর্শনে এসে বৃটিশদের চোখে পড়ে এক হাতি সদৃশ পাথর। এই পাথর থেকেই নাম হয়েছে এলিফ্যান্ট ফলস। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভুমিকম্পে পাথরটা ধ্বংস হলেও নামটা আর বদলায় নি। আমাদের অভিযাত্রী দল ইতিমধ্যে ফিরে এসেছেন। ঝর্ণাদর্শন পুরোপুরি সমাপ্ত করে ফিরে আসার পালা এবার। শেষবারের মত ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে বিদায়ী একখানা ছবি তুলি। ফিরে আসার সময় চোখে পড়লো ছেলেবুড়ো সবাই মিলে মেঘালয়ের খাসিয়াদের রংচঙে রাজকীয় পোশাক পরে ছবি তুলছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করা হল আমি তুলতে চাই কিনা। আমাদের সামনে এক মহিলা নিজের পুত্রকে খাসিয়া রাজপুত্র বানিয়ে নিজে রাণী সেজে ছবি তুলছেন। দৃশ্যটা চোখে পড়তেই পুত্র আমার খটাশ করে বলে এগুলো পরে আমি ছবি তুলবো না। আপনি তুললে তুলেন গিয়ে।

মেয়েদের জিজ্ঞেস করলাম খাসিয়া পোশাক পরে ছবি তুলবে কি না? মেয়েরাও তুলবে না। পঞ্চাশ টাকা খরচ করে আমারও ছবি তুলতে ইচ্ছা করেনা। ফিরে আসি খাবার দোকানে। ঘন্টা দেড়েকের ব্যবধানে আমার পছন্দের সবজি আর লুচি পুরাই সাবাড়। কপাল কুচকে খাসিয়া পাচক জানিয়ে দিলেন আজকের মত সবজি রান্না হবে না। কি আর করা বিফল মনোরথে রওয়ানা দেই ওয়ার্ডস লেকে।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন