আজ শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ইং

আমাদের পৌষপার্বণ

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২১-০১-১৪ ২০:২৮:৫১

ঋতশ্রী দে ত্রাহী :: উৎসব মানুষের মনে নির্মল আনন্দ দান করে। একটি জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তার উৎসবে ফুটে উঠে। তাই উৎসবের বিষয়বস্তু হতে হবে ভালো, সুন্দর এবং মানবিক। মানুষের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে হলে শুধু ভালো খাবার খেলেই হয় না। খাদ্য যেমন দেহকে বাঁচিয়ে রাখে তেমনি নির্মল আনন্দ মানুষের মনকে বাঁচিয়ে রাখে, আয়ু বৃদ্ধি হয়। তাই আনন্দ উৎসবের খুব প্রয়োজন। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নানা উৎসবের আয়োজন করে আসছে।

জাতি হিসেবে আমরা বাঙালিরা উৎসবমুখোর জাতি। ব্যাক্তিগত জীবনে আমরা সকলেই নিজ নিজ কাজ ও নানাধরণের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। উৎসব মানে সেই সমস্ত ব্যস্ততাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সকলে মিলে একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠা। আর আমরা তো বাঙালি, উৎসবে-পার্বণে আমাদের আসল পরিচয় ফুটে ওঠে। কথায় আছে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই কথা থেকেই বোঝা যায় বাঙালি ঠিক কতোখানি উৎসবপ্রিয়। এরকমই পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এই উৎসবটি পালন করা হয়। পৌষ সংক্রান্তি ঘুড়ি উৎসব কিংবা সাকরাইন নামেও পরিচিত। এই দিনে বাঙালিরা বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। পৌষ সংক্রান্তির সময় এলেই প্রত্যেকটি বাঙালি পরিবারে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়।

মা-দিদিমাদের সঙ্গে বাড়ির ছোটরাও পিঠা তৈরির আনন্দে মেতে ওঠে। নতুন ধান, খেজুরের গুড় এবং পাটালি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরণের ঐতিহ্যবাহী পিঠার গন্ধে চারিদিক ম-ম- করে ওঠে। আমাদের মা-দিদিমাদের হাতের সেই আন্তরিকতার ছোঁয়া যেন পিঠার স্বাদ আরও বাড়িয়ে দেয়। সেদিন ভোরবেলায় বাড়ির ছোট বড় সকলে স্নান করে পবিত্র মনে খড়ের তৈরি প্রতীকী ঘর পোড়ায়। যার লোকজ নাম মেড়া-মেড়ীর ঘর। উৎসবের আগের রাতে এই খড়কুটোর ঘর তৈরি করা হয়। রাতে ছোটরা সবাই এই খড়ের ছোট্ট ঘরের ভেতরে বসে গানবাজনা করে, আনন্দ করে এবং পিঠেপুলি খায়।

পরদিন প্রাতঃস্নান শেষে ভোরের শীতল বাতাসে আগুণের উষ্ণ তাপ যেন সকলের মনকে সতেজ করে দিয়ে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। আপনজনদের সঙ্গে পিঠা বিনিময়ের মাধ্যমে চারিদিকে একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। সকালে বের হয় নগরকীর্তন। বাড়ি বাড়ি খোল-করতাল নিয়ে দলবেঁধে সবাই কীর্তন নিয়ে যায়। প্রতিটি বাড়ির উঠোনে বাতাসা, কদমা, তিলুয়া, কমলালেবু , নাড়ু এসব দিয়ে হরিরলুট দেয়া হয়। শিশুরা আনন্দে মেতে উঠে।

 পৌষ সংক্রান্তিতে মাছের মেলা অন্যতম। কথায় আছে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। এই মাছের মেলায় চারপাশের ডালায় সাজানো নানান জাতের মাছ শীতের মিঠেকড়া রোদে যেন চকচক করে। মাছ কেনার পাশাপাশি অনেকে মেলায় নানান জাতের মাছ দেখতেও আসে। হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে জনপথ। পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে অনেক জায়গায় ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এভাবেই বাঙালিরা আনন্দ-উল্লাসে পৌষ সংক্রান্তি পালন করে। তবে এবারের পৌষ সংক্রান্তি অন্যবারের তুলনায় একটু ভিন্ন উপায়ে পালন করতে হবে।

কেননা করোনা নামের অতিমারির ঝড় আছড়ে পড়েছে আমাদের পৃথিবীতে। চারিদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল। সারা বিশ্ব এখন মুক্তির পথ খুঁজছে। তাই এবারে প্রত্যেকটি উৎসব সকল প্রকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে পালন করতে হবে। যাতে পৌষ সংক্রান্তির এই আনন্দঘন মুহূর্তে সকলে নিরাপদ ও সুস্থ শরীরে থাকতে পারে। সবাইকে পৌষ সংক্রান্তির অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

লেখক: শিক্ষার্থী (১০ম শ্রেণী), ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন