আজ শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪ ইং

অনুভবে মিশে আছো

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০২১-০৫-১৮ ১৫:৫৭:২৫

লেখিকা: শ্রাবণী দাস বীথি

শ্রাবণী দাস বীথি :: ২৪ শে ডিসেম্বর। কলেজের ক্যাম্পাসে প্রথম দেখা হয়েছিলো এক মেয়ের  সাথে এক ভদ্রলোকের। ভদ্রলোকের নাম নির্ঝর। আর মেয়েটির নাম মেঘা। তাদের মধ্যে আলাপ পরিচয় হলো। অনেকক্ষণ গল্প হলো। একে অপরকে জানা হলো। তারপর এই কলেজেই কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করল।একসময় বসা হলো সবুজ ঘাসের উপর। শুরু হলো তাদের গল্প। সাথে কিছু বাদাম খাওয়া ও হলো। দুজনের সময় ভালোই যাচ্ছে। একে অপরকে আরো জানা হলো। কথা হলো। মনে হলো দুজনের মধ্যে একটু ভাব জন্ম নিলো। তারপর একটা রেস্টুরেন্টে বসে দুজন মিলে নাস্তা করল।

ভদ্রলোকটি (নির্ঝর) একটা ব্যাংকে চাকরি করেন। আর মেয়েটি (মেঘা) একটা স্কুলে আছে। পাশাপাশি পড়াশুনাও করছে। যাই হোক এখন দুজনেরই যাওয়ার পালা। দুজন দুজনার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। তারপর চলে গেলেন দুজন দুদিকে। কিন্তু মনের মধ্যে দুজনের স্মৃতি রয়ে গেলো। দুজন দুজনাকে ভালো লাগলো। তারপর আরো জানাজানি হলো দুজন দুজনকে। প্রায়ই কথা হতো ফোনে। দেখা খুব একটা হতো না। কারণ দুজনেই ব্যস্ত। তবে দুজন দুজনার প্রতি টান রয়েছে। মেঘা ছিলো যথেষ্ট সুন্দরী। নির্ঝর এতোটা সুন্দর না। তবে মেঘার চোখে ছিলো অসাধারণ। নির্ঝর মেঘাকে প্রথম দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেছে। মেঘার কথাবার্তা চলাফেরা সবই ভালো। নির্ঝরেরও সবই ভালো। কথা বলতে বলতে একসময় দুজন দুজনকে ভালোবাসার কথা জানালো। দুজনেই রাজি হলো। তাদের মনের টান আরো বেড়ে গেলো। মেঘার একটা কাজিন ছিলো নাম তার নিলাদ্রি। নিলাদ্রি শুধুই প্রেম করত। একজনের সাথে ৫ বছর। তো আরেকজনের সাথে ৩ বছর। নিলাদ্রিও একটা ব্যাংকে চাকরি করে। নিলাদ্রি খুব চঞ্চল ও বিলাসীপ্রিয়। নিলাদ্রির একটা বন্ধুর সাথে মেঘার পরিচয় ছিলো। মেঘার সাথেও উনার খুব ভালো সম্পর্ক। উনার নাম কানন। কাননও ভালো লোক। তিনি একজন শিক্ষক। মেঘার সাথে উনার সব রকমই কথা হয়। মেঘা শুধু তার নির্ঝরের কথা কখনো বলে নি। এমনি নানা ধরনের কথা হতো। নিলাদ্রির সাথে কাননের প্রেম ছিলো ৫ বছর। মেঘা সব জানে। তাদের মধ্যে একসময় ব্রেক আপ হয়ে যায়। তাও মেঘা জানে। তাদের ব্রেক আপের কয়েক মাস পর নিলাদ্রি আরেকজনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক করল। কাননের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এক সময় কাননের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। কানন মেঘাকে সব জানায়। কানন মেঘাকে সব বলত। মেঘা ছিলো খুব চুপচাপ স্বভাবের। তাদের মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিলো। কানন মেঘাকে সময় দিত। কারণ মেঘার প্রেম থাকা সত্ত্বেও মেঘা সবসময় একাকী বোধ করত।

একসময় কাননের বিয়ে হয়ে গেলো। মেঘার সাথে খুব একটা যোগাযোগ নেই। নিলাদ্রি তো খুব ভালোই আছে। একদিকে তার চাকরি অন্যদিকে তার নতুন প্রেমিক। মেঘার সারাক্ষণ মন খারাপ থাকত। কারণ তার বন্ধু কানন তাকে ভুলে গেছে। আর খোঁজ নেয় না। এতো মিল ছিল দুজনার মধ্যে। বিয়ের পর কানন মেঘাকে আর মনেই রাখলো না। মেঘা যাকে ভালোবাসে নির্ঝর উনার ব্যস্ততা বেড়ে গেল। খুব একটা কথাবার্তা হয় না।মেঘা সবসময় মনে করে তার জীবনে নির্ঝর আছে। একদিন তার সাথে মেঘার বিয়ে হবে। তারা সুখে সংসার করবে।মেঘা কতো স্বপ্ন দেখতো নির্ঝরকে নিয়ে।কত কিছু কল্পনা করত। মেঘা কিন্তু এতো কিছু নির্ঝরকে প্রকাশ করত না।অল্প কিছু বলত।তার পরিবার যে তার জন্য অন্য মেয়ে ঠিক করে রেখেছে সে কথা কিন্তু মেঘাকে বলে নি। নির্ঝর মনে করে তার পরিবার কে কোনো ভাবেই কষ্ট দেবে না। পরিবারের প্রতি ছিলো খুব দায়িত্বশীল। এতে যাই ঘটে যাক না কেন। মেঘা নির্ঝরকে খুব ভালোবাসে। সেটা কিন্তু নির্ঝর বুঝে। অথচ সেটাকে এতো গুরুত্ব দিত না। ব্যাপারটা কে হালকাভাবে নিয়ে নিত। একদিন মেঘা নির্ঝরকে বলেছিল তুমি আমায় কতোটা ভালোবাসো। নির্ঝর তখন বলেছিল, ভালোবাসি কিন্তু তোমার মত করে নয়। তোমার চেয়ে কম তোমায় ভালোবাসি। মেঘা তখন কিছু বলে নি। চুপ ছিল। আর ভাবছিলো আমি কি খুব ভুল করলাম। মেঘা তবুও তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখত। কিছুদিন পর নির্ঝরের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। মেঘার সাথে যোগাযোগও কমে আসলো। মেঘা মনে মনে ভাবতো যদি কখনো নির্ঝরকে হারিয়ে ফেলি তবে কি করে থাকব। এতোটা ভালোবাসি। কারণ মেঘার জীবন থেকে ভালোবাসার মানুষ বা প্রিয় কিছু খুব সহজেই হারিয়ে যায়। কাউকে এগুলো প্রকাশ করতো না। কিন্তু মনে মনে ভয় পেত। সত্যি সত্যি নির্ঝরের বিয়ের শুভক্ষণ চলে এসেছে।

হঠাৎ একদিন নির্ঝর মেঘাকে বলল তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। মেঘা যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে থমকে গেলো। সে একটি কথাও বলল না। নিরবে চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। কতক্ষণ মেঘা চুপ ছিল। কয়েকমিনিট পর বলল কোথায় বিয়ে?নির্ঝর তখন বলল পরিবার ঠিক করেছে। আমি এতো কিছু জানি না। মেঘা তখন বলল, কেন মেয়ের সাথে কথা হয় নি? নির্ঝর বলল না কোনো কথা হয় নি।শুধু জানি মেয়ে শিক্ষিকা। নাম তার শ্রীদেবী। মেঘা বলল, ভালো তো। খুশি হলাম। তোমার জন্য শুভ কামনা রইল। সুখে থেকো আজীবন। নির্ঝরের পথ আর মেঘার পথ আলাদা হয়ে গেল। দুজনার পথ দুইদিকে। মেঘার তখন দুইটা গানের লাইন মনে পড়ল।

আজ দুজনার দুটি পথ ও গো
দুটি  দিকে গেছে বেঁকে।

আর দুচোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু চুপচাপ। এই চুপচাপ থাকা মেয়েটি খুব একা হয়ে গেল। সব সময় সে নিজের কষ্ট গুলিকে লুকিয়ে রাখত অথচ সবার সামনে হাসিমুখে থাকত। আরেকটা কথা তো বলাই হয় নি। মেঘার একটা ক্লাসমিট ছিল তার নাম রৌদ্র। সে প্রথম যেদিন মেঘাকে দেখেছিল সেইদিন থেকে মেঘাকে সে ভালোবাসত। কিন্তু মেঘাকে বলার সাহস পেত না। যখন পড়াশোনা প্রায় শেষের দিকে তখন রৌদ্র মেঘাকে বলেছিলো তার ভালোবাসার কথা। কিন্তু মেঘা কিছুতেই রাজি হয় নি। কারণ ভালোবাসা তো আর জোর করে হয় না। আর মানুষ তো একবারই প্রেমে পড়ে। রৌদ্র যেমন মেঘাকে প্রথম দেখেই ভালোবেসেছে। মেঘাও তো নির্ঝরকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসেছে। দুজনের মধ্যে প্রেম ছিল। মেঘা কখনও কিন্তু রৌদ্রকে তার ভালোবাসার ডাকে সাড়া দেয় নি। রৌদ্র  ১২ বছর থেকে আজও মেঘার পথ চেয়ে বসে আছে। মেঘার সাথে মাঝেমাঝে রৌদ্রের কথা বার্তা হতো ফোনে। কিন্তু মেঘা একবারের জন্য হলেও রৌদ্রকে ক্লাসমিট ছাড়া আর কিছুই ভাবে নি। রৌদ্র মেঘাকে বলত সে মেঘার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করবে। মেঘা এসব কথা পছন্দ করত না। একসময় তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল। রৌদ্রের সাথে আর যোগাযোগ নেই। মেঘার জীবন সেই মেঘে ঢাকার মতন হয়ে গেল।

তার জীবনে বন্ধুবান্ধব প্রেমিক কেউ রইলো না। একাকী ভাবে চলতে থাকল। একসময় মেঘার পরিবারে একটা ঝড় আসলো। সেই ঝড়ে মেঘার পরিবার একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। মেঘা তার পরিবারকে হারালো। সে তার পরিবারকে খুব ভালোবাসত। সে তার পরিবারের কাছে থেকেছে। কিন্তু পরিবার তার কাছে থাকে নি। সবাই ছেড়ে চলে গেছে। শুধু রয়ে গেলো মেঘা। আজ মেঘার পাশে কেউ নেই। মেঘার জীবনে আজ শুধুই স্মৃতি হয়ে জমে আছে। সে না পারছে কাউকে কিছু বলতে না পারছে নিজে সয়ে নিতে। মেঘার জীবন সবার চেয়ে একদম আলাদা।একদম নিরব মনের মানুষ। এখন কারো সাথে খুব একটা কথা বলে না। সব সময় একাই থাকে। মেঘা সবাইকে খুব অনুভব করে। মেঘা যাদেরকে খুব ভালোবাসত, পছন্দ করত তারা আজ কেউ পাশে নেই। মেঘা সব সময় বলে, তার জীবনে ভালো কিছু থাকে না। প্রিয়জন থাকে না। ভালোবাসার মানুষ থাকে না। মেঘার মনে খুব কষ্ট। খুব দু:খ। এতো যন্ত্রণার মাঝে ও সে নিজেকে সামলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সে দুটি লাইন প্রায়ই বলে।

মনে পড়ে যায় সে দিনের কথা
সেই দিন আজ স্মৃতি হয়ে রয়,
শুধু অন্তরের মাঝে আর কোথাও নয়।

মেঘার জীবনে আর কেউ কোথাও নেই। শুধু অন্তরের মাঝে সবাই বেঁচে আছে। যে যেখানে আছে তারা হয়তো ভালো আছে। কিন্তু মেঘার জীবনে আজ শুধুই অন্ধকার। সে আর কারো প্রতীক্ষায় থাকে না। কারণ তার আর কিছু পাবার নেই, আর হারাবারও কিছু নেই। মেঘার মনে কেবল স্মৃতি ছাড়া কিছুই নেই। সব কিছুই মনের মাঝে মিশে আছে। সব ভালোবাসার মাঝে মেঘা আজ মূল্যহীন।  মেঘা শুধু বলে পাশে নেই কেউ। পরিবার নেই, বন্ধু বান্ধব নেই, প্রেমিক নেই, ভালোবাসার মানুষ নেই, প্রিয়জন নেই। চারিদিকে এতো নির্জনতা, এতো নিরবতা, এতো হাহাকার, এতো হতাশা, এতো যে ব্যথা। আমি আজ বড় একা। এতো বড় পৃথিবীতে আমি খুব একা। আমার জীবনে কেউ রইলো না। মনে পড়ে যায় কিছু স্মৃতি।

হাজার লোকের ভীড়ে
আমি বড় একা খুব একা।

মেঘার অনুভবে সবাই মিশে আছে। আর মিশে থাকবেও চিরদিন।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন